যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আবারও বড় ধরনের সামরিক হামলার হুমকি দেওয়ার পর কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে তেহরান। পারমাণবিক কর্মসূচি ও যুদ্ধ বন্ধে নতুন প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি রাশিয়া, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। খবর আল জাজিরার।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। ওয়াশিংটনের নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে তারা। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের বাকি অংশও ‘ধ্বংস’ করতে হতে পারে। তবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা শিগগিরই জানা যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে হরমুজ প্রণালির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনায় উত্তেজনা আরও বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। নতুন করে বড় ধরনের হামলা হলে আরও ব্যাপক প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ইরান।
বৃহস্পতিবার কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক কর্মসূচি ও শান্তি নিয়ে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। তবে তেহরানের সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনায় বসবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। প্রস্তাবটি বর্তমানে পর্যালোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া। এসব শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া বা শান্তি আলোচনা শুরু করা হবে না বলে জানিয়েছেন ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠক ইরানি কর্মকর্তার
কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার মস্কো সফর করেন ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি। ক্রেমলিনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এ সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি বার্তা পুতিনের কাছে পৌঁছে দেন রেজায়ি। তবে বার্তার বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।
বৈঠককে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময়’ বলে উল্লেখ করেছেন রেজায়ি। তার দাবি, রাশিয়ার সঙ্গে গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ইরানের গ্যাস সংকট মোকাবিলা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে রুশ জ্বালানি বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার অভিযান শুরুর পর থেকে মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছে ইরান। অন্যদিকে, রাশিয়া ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ এবং সামরিক প্রযুক্তি-সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে, ইরানকে হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষেপযোগ্য নির্ভুল নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক সরবরাহে রাশিয়ার সম্মতির কথা জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। তবে এ বিষয়ে মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বৃহস্পতিবার উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান, কুয়েত ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও উত্তেজনা কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানির সঙ্গেও কথা বলেন আরাঘচি। আলোচনায় আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং সমুদ্রপথে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
যুদ্ধের সময় ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বেসামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলায় সহযোগিতা করা কোনো দেশ বা বাহিনীকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান।
ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের পাল্টা সতর্কতা
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এরপরও ইরানে নতুন করে হামলার সম্ভাবনা নাকচ করেননি ট্রাম্প।
ইরানের সাবেক কূটনীতিক হাদি আফগাহির মতে, যুক্তরাষ্ট্র নমনীয় হলে সমঝোতার পথ সহজ হতে পারে। তবে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তার আশপাশে কঠোর অবস্থানের সমর্থকেরা রয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন আফগাহি।
শুক্রবার কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। আলোচনায় আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়। কাতারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংকটের অবসানে একটি সমন্বিত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে আরও বড় পরিসরে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রকে হামলায় সহযোগিতা করা যেকোনো দেশ বা বাহিনীকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলেও সতর্ক করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
যুদ্ধের আগে থেকেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরোধ চলছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরান সেখানে জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। অন্যদিকে, ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপের পাশাপাশি প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচলে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনীর দাবি, এ সপ্তাহে অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত পথের বাইরে দিয়ে যাওয়ার সময় মাইনে আঘাত লেগে অন্তত সাতটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। শুক্রবার দুটি তেলবাহী জাহাজ মাইনে আঘাত পেয়ে থেমে যায় বলেও দাবি করেছে তারা। তবে সামুদ্রিক সংস্থাগুলো এসব সর্বশেষ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতবিরোধের কারণে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা এখনো জটিল অবস্থায় রয়েছে।
ম্যাংগোটিভি / আরএইচ


