প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করেছে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি। এবার বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায় কোম্পানিটি। সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি কেনা ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা হবে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ ও আইপিও-সংশ্লিষ্ট খরচ মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে আয়োজিত এক রোড শোতে কোম্পানির ব্যবসা, আর্থিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক ও অন্যান্য যোগ্য বিনিয়োগকারীদের সামনে আইপিওর প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালেদ ইসলাম জানান, বগুড়া, রংপুর ও চিরিরবন্দরে স্থাপিত চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে কোম্পানিটির উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। যাত্রা শুরুর দুই বছরের মধ্যেই চারটি কেন্দ্র চালু করতে সক্ষম হয় প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন জার্মান প্রযুক্তির ইঞ্জিন ও টার্বোচার্জিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি কো-জেনারেশন প্রযুক্তিতে ইঞ্জিন থেকে নির্গত তাপ কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এ প্রযুক্তিতে স্টিম টারবাইন ব্যবহার করে প্রায় ২৪ থেকে সাড়ে ২৪ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এতে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় ছাড়াই উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রযুক্তির সমন্বয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক দক্ষতা প্রায় ৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে খালেদ ইসলাম বলেন, বগুড়ায় কেন্দ্র স্থাপনের সময় প্রায় ৩৮০ টন ওজনের ইঞ্জিন পরিবহন ও স্থাপন করতে হয়েছে। নদীপথের সুবিধা না থাকায় ইঞ্জিনগুলোকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে বিশেষ ব্যবস্থায় পরিবহন করা হয়। এ কাজে সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যবস্থার সমন্বয় করতে হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সেতু নির্মাণেরও প্রয়োজন হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ফ্রান্স থেকে প্রতিটি ইঞ্জিনের প্রায় ১০ হাজার যন্ত্রাংশ এনে সেগুলো সংযোজন ও চালু করা হয়। কনফিডেন্স গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সহায়তায় এ কাজ সম্পন্ন হয়। ইঞ্জিনগুলো শুরু থেকে সংযোজনের অভিজ্ঞতা কোম্পানির প্রকৌশলীদের যন্ত্রাংশের কার্যপ্রণালি সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করেছে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে নিজস্ব দক্ষতা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে কোম্পানিটি। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, চট্টগ্রামে পরিবহন, সেখান থেকে ট্যাংকারে নির্ধারিত স্থানে নেওয়া এবং পরে সড়কপথে বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার সমন্বিত ব্যবস্থা রয়েছে।
খালেদ ইসলাম জানান, এ ব্যবস্থায় বছরে প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি ৪০ টন ধারণক্ষমতার জ্বালানিবাহী লরি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও জ্বালানি পরিবহনে অর্জিত অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রকল্প বাস্তবায়নেও কাজে লাগবে।
২০৩৫ সালের মধ্যে সক্ষমতা ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ানোর লক্ষ্য
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির চেয়ারম্যান ইমরান করিম বলেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে কোম্পানিটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য সৌরবিদ্যুৎ, এলএনজি অবকাঠামো, কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ব্যাটারিভিত্তিক জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৩১ টাকা ৮৩ পয়সা। শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৯৩ টাকা ২৩ পয়সা। কোম্পানির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি আয় প্রায় ৬৩ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ৪১৩ টাকায় উন্নীত হতে পারে।
কোম্পানির পরিচালক সালমান করিম বলেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের সবচেয়ে লাভজনক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোর একটি হতে চায় কনফিডেন্স গ্রুপ। এ সময়ের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি করার পাশাপাশি মোট সক্ষমতার ৭০ শতাংশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎস থেকে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, কক্সবাজারের লংলা এলাকায় ১০০ মেগাওয়াট এবং পঞ্চগড়ে ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে কোম্পানিটি। এ ছাড়া গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার পিএলসি সোনাগাজীতে ২২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা, সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষা ও চালুকরণের কাজের জন্য ইজিসিবির অধীনে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
সালমান করিম বলেন, প্রকৌশল, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন, স্টিল ফ্যাব্রিকেশন ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে গ্রুপটির অভিজ্ঞতা সৌরবিদ্যুৎ খাতে সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। ‘ভিশন ২০৩৫’-এর আওতায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় অবদান বাড়াতে চায় গ্রুপটি।
সুশাসন ও স্বচ্ছতায় গুরুত্ব
কোম্পানির পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের দক্ষতা ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। এবিবি, সিমেন্স, রোলস-রয়েস, ম্যান ও জিই পাওয়ারের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা গ্রুপটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, সুশাসন, স্বচ্ছতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের ভিত্তি। আইপিও কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
কোম্পানির পরিচালক জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা এবং দূরবর্তী এলাকায় জ্বালানি পরিবহনে কনফিডেন্স গ্রুপের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দক্ষ ব্যবস্থাপনা দল ও নেতৃত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চায় কনফিডেন্স গ্রুপ।
আইপিওর অর্থ ব্যয়
কোম্পানির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আইপিওর মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ অর্থের প্রায় ৮৩ শতাংশ দুটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি কেনা ও অবকাঠামো নির্মাণে, ১৫ শতাংশ ঋণ পরিশোধে এবং বাকি ২ শতাংশ আইপিও-সংশ্লিষ্ট খরচে ব্যয় করা হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মধ্যে চট্টগ্রামে ১০০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বাগেরহাটের মোংলা এলাকায় যৌথ উদ্যোগে আরও ১০০ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্প রয়েছে। এ দুটি প্রকল্পে আইপিওর অর্থ থেকে যথাক্রমে প্রায় ২৩০ কোটি ও ১০২ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণের একাংশ পরিশোধে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং আইপিও-সংশ্লিষ্ট খরচে ৮ কোটি টাকা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইপিওর অর্থের একটি অংশ দিয়ে কনফিডেন্স ডরিন পাওয়ার লিমিটেডে ইক্যুইটি বিনিয়োগ এবং কক্সবাজারে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে আরও ২৬০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আর্থিক চিত্র
কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সমন্বিত ইপিএস ছিল ৩১ টাকা ৮৩ পয়সা। এর আগের দুই অর্থবছরে তা ছিল যথাক্রমে ৩২ টাকা ৪৩ পয়সা ও ৩১ টাকা ৩৩ পয়সা। ২০২৬ সালের ৩০ জুন শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ১৯৩ টাকা ২৩ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৬১ টাকা ৪৯ পয়সা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটির আয় ছিল ১ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল ৪৭৭ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুন শেষে কোম্পানির মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকঋণের পরিমাণ ছিল ৮১৮ কোটি টাকা।
কোম্পানির পরিচিতি
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি ২০১৭ সালে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ২০২৪ সালে এটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ২৫০ কোটি টাকা এবং আইপিও-পূর্ববর্তী পরিশোধিত মূলধন ১৪৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
কোম্পানিটি একটি হোল্ডিং প্রতিষ্ঠান। এর অধীনে রয়েছে কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া লিমিটেড, কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুর লিমিটেড, জোডিয়াক পাওয়ার চিটাগং লিমিটেড এবং কনফিডেন্স ডরিন পাওয়ার লিমিটেড।
প্রথম তিনটি প্রতিষ্ঠান ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করে। বগুড়া ও রংপুরের কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১১৩ মেগাওয়াট করে এবং জোডিয়াক পাওয়ার চিটাগংয়ের সক্ষমতা ৫৪ দশমিক ৩৬ মেগাওয়াট।
কনফিডেন্স ডরিন পাওয়ার লিমিটেড কনফিডেন্স পাওয়ার ও ডোরিন পাওয়ারের যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, যেখানে কনফিডেন্স পাওয়ারের অংশীদারত্ব ৬০ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। প্রকল্পটির উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য সরকারের সঙ্গে ২০ বছর মেয়াদি চুক্তি হয়েছে বলে কোম্পানির তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
ম্যাংগোটিভি / আরএইচ
