সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় আড়াই গুণ বাড়ানোর সুপারিশ করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অধিকাংশ উপদেষ্টা। এ কারণে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন আপাতত প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে তাঁর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, কয়েকজন উপদেষ্টা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাবকে বৈষম্যমূলক বলে মন্তব্য করেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের সীমিত আয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়ানোর পক্ষে মত দেন তারা। এ মতের সঙ্গে আরও দুইজন উপদেষ্টা একমত পোষণ করেন।

একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বৈঠকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেন নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর না করে, সে জন্য বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে। তাঁর মতে, বেতন কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সরকারের জন্য রেখে দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় আড়াই গুণ বাড়ানোর সুপারিশ করায় বেতন কমিশনের প্রতিও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটি গঠনের কথা থাকলেও উপদেষ্টাদের অসন্তুষ্টির কারণে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। ফলে বর্তমান সরকারের আমলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ধারাবাহিকতা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থমন্ত্রী বিষয়টি আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে পর্যালোচনা করে মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপন করতে পারেন। প্রয়োজনে প্রস্তাব পরিবর্তনের সুযোগও থাকবে।

এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত কোনো কমিটি এখনো গঠন করা হয়নি। কমিটি গঠিত হলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে বাড়তি অর্থের জোগান কীভাবে আসবে-এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি সেখান থেকে চলে যান।

জানা গেছে, বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই হারে পেনশন, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

এদিকে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সরকারি কর্মচারীরাও। প্রস্তাবিত কাঠামোতে দশম গ্রেডে বেতন ধরা হয়েছে ৩২ হাজার টাকা এবং নবম গ্রেডে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা—যেখানে পার্থক্য ১৩ হাজার টাকা। অথচ ২০ থেকে ১১ গ্রেড পর্যন্ত বেতনের পার্থক্য মাত্র ৫ হাজার টাকা এবং ২০, ১৯ ও ১৮ গ্রেডে পার্থক্য মাত্র ৫০০ টাকা।

সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক ওয়ারেছ আলী বলেন, বেতন কমিশনের সুপারিশে কর্মচারীদের মূল দাবি প্রতিফলিত হয়নি। তাদের দাবি ছিল ১:৪ অনুপাতে গ্রেড পুনর্গঠন করে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা, যা প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

বেতন কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সচিবালয়ে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

ম্যাংগোটিভি /আরএইচ

Share.
Exit mobile version