দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে অকেজো, উৎপাদন বন্ধ থাকা ও নিয়মিত লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোকে মূল বোর্ড থেকে সরিয়ে একটি পৃথক প্ল্যাটফর্মে নেওয়ার সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি। প্রস্তাবিত এই নতুন প্ল্যাটফর্মটির নাম রাখা হয়েছে ‘আর-ক্যাটাগরি’।
মূলত পচা বা জাঙ্ক শেয়ার নিয়ে বাজারে চলমান অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি, কারসাজি ও জল্পনা-কল্পনা বন্ধ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কমিটি।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ‘আর-ক্যাটাগরি’ভুক্ত শেয়ারের লেনদেনে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। এই ক্যাটাগরির শেয়ার কেনার পর অন্তত এক মাস পর্যন্ত বিক্রি করা যাবে না (লক-ইন পিরিয়ড)। পাশাপাশি সাধারণ শেয়ারের ক্ষেত্রে যেখানে লেনদেন নিষ্পত্তিতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে, সেখানে ‘আর-ক্যাটাগরি’র ক্ষেত্রে সেটি বাড়িয়ে সাত দিন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের এই কমিটি গত বছরের নভেম্বর মাসে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়াতে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ তহবিল চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ৬০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয় করমুক্ত রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ৩৯৭টি কোম্পানির মধ্যে ২০৫টি ‘এ’, ৮২টি ‘বি’ এবং ১১০টি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। কমিটির মতে, ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকা বহু কোম্পানি বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ রেখেও মাঝে মাঝে অস্বাভাবিকভাবে দর বাড়িয়ে বাজারে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
উদাহরণ হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত জিল বাংলা সুগার মিলস–এর শেয়ারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার দর কয়েক দিনের ব্যবধানে ৮২ টাকা থেকে বেড়ে ১৭৫ টাকায় ওঠে—যা কোম্পানির বাস্তব আর্থিক অবস্থার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
ডিএসইর তথ্যমতে, বর্তমানে অন্তত ৩২টি কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে, যার বড় অংশই বস্ত্র খাতভুক্ত। এর মধ্যে মেঘনা পিইটি ইন্ডাস্ট্রিজ ২০০২ সাল থেকে, অর্থাৎ টানা ২৩ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট ও লোকসানি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতে ব্যবসা পুনরায় চালুর কোনো সম্ভাবনাও নেই।
এই পরিস্থিতিতে এসব কোম্পানির জন্য একটি সম্মানজনক ‘এক্সিট প্ল্যান’ বা বাজার থেকে সরে যাওয়ার ব্যবস্থা তৈরির পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।
বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, বন্ধ ও অকার্যকর কোম্পানিগুলো মূল বোর্ডে থাকার কারণে বাজারের স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। প্রস্তাবিত ‘আর-ক্যাটাগরি’ চালু হলে মূল বাজারের জঞ্জাল কমবে এবং বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ শেয়ারে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন বলে মনে করছে কমিটি।
কমিটির মতে, আইসিবির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিএসইসির সুশাসন নিশ্চিত করলেই কেবল পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার সম্ভব।
