তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখানো রাজনৈতিক সহনশীলতা ও উদারতার পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েও খালেদা জিয়া কখনো প্রতিহিংসা ছড়াননি; বরং তরুণ সমাজকে ধৈর্য ধরার এবং দেশ পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়ে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
বেগম খালেদা জিয়া স্মরণে শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘অপরাজেয় বেগম খালেদা জিয়া’ শীর্ষক নাগরিক শোকসভায় এসব কথা বলেন বক্তারা।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, উত্থানপর্বে বেগম খালেদা জিয়া বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে দলকে সংগঠিত করে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে সরকারপ্রধান হিসেবে তাকে দেখা গেছে এবং ২০০৭ সালের পর তিনি নানাভাবে নিগৃহীত ও নির্যাতিত হয়েছেন। উত্থানপর্বেই তিনি আপসহীনতার তকমা পেলেও শেষপর্বে তার ভিকটিম হওয়া মানুষের সহানুভূতি সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার শেষ বক্তব্য প্রতিহিংসা থেকে সরে আসার বার্তা দেয়। অন্যকে আলো দিতে হলে নিজেকে মোমবাতি হতে হয়-এই শিক্ষা তিনি রেখে গেছেন।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, বিগত সরকার আমলে বেগম খালেদা জিয়াকে নানাভাবে নিষ্পেষণ করা হয়েছে, গৃহবন্দি অবস্থায় মানবিক চিকিৎসাসেবাও দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট তার দেওয়া বাণী ছিল ধ্বংস ও প্রতিহিংসার বিপরীতে উদারতার প্রকাশ। এই মানসিকতা ধারণ করতে পারলে আগামীর বাংলাদেশ ভিন্ন রকম হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্ষিয়ান সাংবাদিক ও যায়যায় দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে আমৃত্যু একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন খালেদা জিয়া। সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গণতন্ত্রে উত্তরণের সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সবাইকে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, বেগম খালেদা জিয়া যখন বন্দি ও অসুস্থ ছিলেন, তখন পুরো দেশই কার্যত কারাবন্দি ছিল। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ভালো রাখতে হলে খালেদা জিয়ার আদর্শ ধারণ করতে হবে।
নিউ এজ সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর বলেন, খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী ছিলেন না; তিনি মানুষ ও দেশের নেত্রীতে পরিণত হয়েছিলেন। দলমত নির্বিশেষে লাখো মানুষের জানাজায় অংশগ্রহণ তারই প্রমাণ।
লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ বলেন, এই জনপদের মানুষ খালেদা জিয়াকে মনে রাখবে তার ত্যাগ, সততা ও অত্যাচার সহ্য করার অপরিসীম ক্ষমতার জন্য। তার আদর্শ ধারণ করলেই দল ও দেশ রক্ষা পাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসক দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি। চিকিৎসায় ইচ্ছাকৃত অবহেলাই তার লিভার ফাংশনের অবনতি ঘটিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বিষয়টি তদন্তের দাবি জানান চিকিৎসক।
নাগরিক শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে. আর. মোদাচ্ছির হোসেন। উপস্থাপনায় ছিলেন আশরাফ কায়সার ও কাজী জেসিন। কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে শোকসভা শুরু হয়। পরে খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকবার্তা পাঠ করেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন। শেষে দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে শোকসভা শেষ হয়।
শোকসভায় সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
