বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম এক মাস ছিল মূলত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের সময়। আবেগ বা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে থেকে বিচার করলে-প্রশাসনিক কার্যক্রম, রাজনৈতিক আচরণ, জনসম্পৃক্ততা, যোগাযোগ কৌশল এবং অর্থনৈতিক কার্যকারিতা-এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই তার নেতৃত্বের প্রাথমিক রূপরেখা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
প্রশাসনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত সচিবালয়ে উপস্থিতি একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এতে আমলাতন্ত্রে কিছুটা গতিশীলতা এসেছে, জবাবদিহিতার চাপ বেড়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কিছুটা ত্বরান্বিত হয়েছে। তবে এ পরিবর্তন এখনো আচরণগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। কাঠামোগত বা নীতিগত বড় কোনো সংস্কার দৃশ্যমান নয়। দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর পরিবর্তনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অনিবার্য।
জনবান্ধব আচরণে সরকার শুরু থেকেই কিছু প্রতীকী কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে। ভিআইপি চলাচলে সড়ক বন্ধ না রাখা, অতিরিক্ত প্রোটোকল কমানো কিংবা আনুষ্ঠানিকতা পরিহার-এসব উদ্যোগ সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতার দূরত্ব কমিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো সীমিত। তা সত্ত্বেও জনমনে ইতিবাচক ইমেজ তৈরিতে এগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। অতীতনির্ভর রাজনীতি থেকে সরে এসে নতুন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা এবং ব্যক্তি-নির্ভর প্রচারণা কমানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া-কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে অতিরিক্ত ব্যবহার না করার প্রবণতা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে দলীয় পর্যায়ে এ পরিবর্তন এখনো সুসংহত হয়নি।
যোগাযোগ কৌশলে সরকারের অবস্থান কিছুটা ভিন্নধর্মী। কম সংবাদ সম্মেলন এবং কম প্রচারণামুখী অবস্থান রাজনৈতিক নাটকীয়তা কমিয়েছে, যা একদিকে ইতিবাচক। কিন্তু অন্যদিকে এটি জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে একটি ফাঁকও তৈরি করতে পারে। নীতিগত স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অর্থনীতি-এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এক মাসে বড় পরিবর্তন প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়, তবে এখনো পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগ, বাজার নিয়ন্ত্রণ কিংবা কর্মসংস্থানে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সামনে ৬ থেকে ১২ মাস এই সরকারের জন্য নির্ধারক সময় হয়ে উঠবে। ‘ইমেজ’ থেকে ‘পারফরম্যান্স’-এ রূপান্তর ঘটাতে না পারলে প্রাথমিক ইতিবাচকতা ধরে রাখা কঠিন হবে।
নেতৃত্বের দিক থেকে প্রধানমন্ত্রীর লো-প্রোফাইল উপস্থিতি, প্রশাসনিক ফোকাস এবং সীমিত প্রচারণা একটি নতুন ধরণের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইঙ্গিত দেয়। তবে বড় সংকট মোকাবিলায় দৃঢ় ও সিদ্ধান্তমূলক নেতৃত্ব প্রদর্শনই হবে তার প্রকৃত পরীক্ষা।
তবে কিছু সমালোচনাও রয়েছে। পরিবারকেন্দ্রিক কিছু কনটেন্টের উপস্থিতি এবং স্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনার অভাব প্রশ্ন তৈরি করছে। পাশাপাশি দলীয় সংস্কারের ক্ষেত্রেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
সব মিলিয়ে, প্রথম এক মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি ইতিবাচক ইমেজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এখন সময় সেই ইমেজকে বাস্তব নীতিগত পরিবর্তন এবং দৃশ্যমান অর্থনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করার।
চূড়ান্ত কথা: ভালো সূচনা হয়েছে-কিন্তু এখনই আসল পরীক্ষার সময়।
মুহম্মদ তৌফিকুল ইসলাম
সম্পাদক, ম্যাংগো টিভি
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ম্যাংগো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড।
ম্যাংগোটিভি /আরএইচ
