রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার দুই দিনের সরকারি সফরকে ঘিরে কয়েক দিন ধরেই বদলে গেছে জেলার চেনা চিত্র। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনাগুলোতে চলছে সাজসজ্জা, নির্মাণ করা হয়েছে তোরণ, কোথাও চলছে আলোকসজ্জা। পাশাপাশি চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ।
রাষ্ট্রপতির আগমন ঘিরে প্রশাসনের ব্যস্ততার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে বাড়তি কৌতূহল। স্থানীয়রা এটিকে শুধু রাষ্ট্রপতির জেলা সফর নয়, নিজের শহরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিনের পরিচিত ‘আলমগীর স্যার’ এবার ফিরছেন দেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে।
সফর সামনে রেখে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সড়কের ডিভাইডার ও বিভিন্ন স্থাপনায় রঙের কাজ করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তোরণ ও আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির যাতায়াতের সম্ভাব্য পথ ও কর্মসূচির স্থানগুলোতেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা।
জেলা প্রশাসন, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রফিকুল হক জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির দুই দিনের সফরকে কেন্দ্র করে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর, সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচিগুলো সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে।
তিনি জানান, নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কর্মসূচির স্থান ও যাতায়াতের পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো রাখা হচ্ছে বিশেষ নজরদারির আওতায়।
যেসব কর্মসূচি রয়েছে
সফরসূচি অনুযায়ী, রোববার সকাল ১০টায় হেলিকপ্টারযোগে ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রাষ্ট্রপতির। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে ঠাকুরগাঁও মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়াম মাঠে তার অবতরণের কথা রয়েছে। সেখান থেকে তিনি জেলা সার্কিট হাউজে যাবেন এবং গার্ড অব অনার গ্রহণ করবেন।
এরপর রাষ্ট্রপতি শহরের সেনুয়া এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে যাবেন। সেখানে বাবা সাবেক মন্ত্রী মির্জা রুহুল আমীন ও মা ফাতেমা বেগমের কবর জিয়ারত করবেন তিনি।
কবর জিয়ারত শেষে কালীবাড়ির নিজ বাসভবনে যাবেন রাষ্ট্রপতি। সেখানে দুপুরের খাবার ও বিশ্রামের পর বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বড় মাঠে নাগরিক কমিটির আয়োজনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। পরে নিজ বাসভবনে ফিরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, আত্মীয়স্বজন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি।
সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে সদর উপজেলার জামালপুর এলাকায় প্রস্তাবিত ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা রয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। ফলে রাষ্ট্রপতির সফরের এই কর্মসূচিকে জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জেলার উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়বে এবং শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে উচ্চশিক্ষার জন্য জেলার বাইরে যেতে হবে না।
রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা
রাষ্ট্রপতির আগমনকে ঘিরে আনন্দ-উচ্ছ্বাস থাকলেও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশার তালিকাও কম নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানসহ জেলার দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয় সামনে আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রথম ঠাকুরগাঁও সফর আমাদের জন্য আনন্দ ও গর্বের। তিনি আমাদের জেলার সন্তান। তার এই সফরকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে, তা সত্যিই অন্যরকম। বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার একটি বড় বাস্তবায়ন।’
আরেক বাসিন্দা বুলবুল আহমেদ বলেন, ‘আমরা তাকে এতদিন আলমগীর স্যার হিসেবে দেখে এসেছি। এখন তিনি রাষ্ট্রপতি হয়ে নিজের শহরে আসছেন—এটা আমাদের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তাকে একনজর দেখতে এবং স্বাগত জানাতে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমরা চাই, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর দিকেও নজর দেবেন।’
নাগরিক সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ডা. আবু মো. খয়রুল কবির বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি শুধু দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি নন, তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের সন্তানও। নিজের মানুষের কাছে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার ফিরে আসা জেলার মানুষের জন্য গর্ব ও আবেগের বিষয়।’
সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা
ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. বেলাল হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপতির সফরকে ঘিরে জেলায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির যাতায়াতের পথ, কর্মসূচির স্থান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে। পর্যাপ্তসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিরাপত্তাব্যবস্থা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির সফরের প্রতিটি কর্মসূচি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচল ও জেলার স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতেও পুলিশ কাজ করছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রথম নিজ জেলা সফর ঘিরে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও নিরাপত্তার আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওবাসীর মধ্যে তৈরি হয়েছে আবেগ ও কৌতূহল। তোরণ, আলোকসজ্জা, প্রশাসনের ব্যস্ততা আর মানুষের আগ্রহে রাষ্ট্রপতির আগমন ঘিরে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে পুরো জেলা।
ম্যাংগোটিভি /আরএইচ
