Thursday, September 24

সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা বাড়ানো, নতুন প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি এবং দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়। সরকারি গেজেটে অধ্যাদেশটি প্রকাশিত হয়েছে।

জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম (এনআইসিটিএফ) বলছে, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়াতে তাদের দীর্ঘদিনের গবেষণা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও সুপারিশের বড় একটি অংশ নতুন অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সংগঠনটির দাবি, নতুন বিধানের ফলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, উচ্চ বার্ষিক টার্নওভার বা বড় সরকারি চুক্তির অভিজ্ঞতার মতো শর্তের কারণে যেসব নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তা সরকারি ক্রয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতেন না, তাদের জন্য সুযোগ তৈরি হবে।

নতুন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ

এনআইসিটিএফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন অধ্যাদেশে যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন শর্ত আরোপ না করার বিধান রাখা হয়েছে, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নতুন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান বা নবীন উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ সীমিত করে।

এ ছাড়া কেবল দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা, উচ্চ বার্ষিক টার্নওভার, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা বা একক বড় চুক্তির অভিজ্ঞতাকে বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে নির্ধারণ না করার বিধান রাখা হয়েছে। তবে প্রকল্পের জটিলতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় বিশেষ শর্ত আরোপের সুযোগ থাকবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

দেশীয় পণ্য ও আইসিটি সেবায় অগ্রাধিকার

নতুন বিধানে দেশীয় শিল্পের বিকাশ, স্থানীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি ক্রয়ে বাংলাদেশে উৎপাদিত বা প্রস্তুতকৃত পণ্য ও আইসিটি সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনআইসিটিএফ।

সরকার প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের দেশীয় পণ্য ক্রয়ের বিষয়েও বিধান করতে পারবে বলে সংগঠনটির দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুযোগ

দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা এবং নতুন দরদাতা, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র দরদাতা, নারী দরদাতা এবং সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তিদের সরকারি ক্রয়ে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে যোগ্যতার শর্ত শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া পূর্ববর্তী অনধিক ২০ বছরের মধ্যে বৈধ লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও অনুকূল পরিবেশের অভাবে সরকারি ক্রয়ে অংশ নিতে না পারা ব্যক্তিদের ‘সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তি’ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্তকরণে স্বচ্ছতা

ক্রয় প্রক্রিয়ায় কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবের আনুপাতিক মূল্যায়নে টেকসই উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। কারিগরি প্রস্তাবের মূল্যায়ন ও অনুমোদন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর্থিক প্রস্তাব নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে।

এরপর আগ্রহী দরদাতাদের উপস্থিতিতে সংরক্ষিত আর্থিক প্রস্তাব এবং দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় উন্মুক্ত করে মূল্যায়ন সম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে বলে এনআইসিটিএফ জানিয়েছে।

প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ

চুক্তি স্বাক্ষরের পর সফল দরদাতা বা পরামর্শকের প্রকৃত মালিকানা এবং চুক্তিসংক্রান্ত তথ্যসহ নোটিশ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার বিধানও রয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নিষিদ্ধ করার আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ

কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ বা কালো তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরুর আগে অভিযোগের বিবরণসহ লিখিত কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনআইসিটিএফ।

প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় বিপিপিএ

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি বা বিপিপিএকে ক্রয়কারী ও সংশ্লিষ্ট জনবলের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়ার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি ক্রয় প্রক্রিয়ার আধুনিকায়নে গবেষণা পরিচালনার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে সংগঠনটির তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংশোধনের উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা, সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, চুক্তি ব্যবস্থাপনার বিধান সম্প্রসারণ এবং উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন।

এনআইসিটিএফের দাবি

এনআইসিটিএফ জানিয়েছে, সরকারি প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে তারা ‘পিপিআর রিফর্ম ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করেছিল। সংগঠনটির দাবি, ১২ সদস্যের এই দলের গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নীতিগত সংস্কারের জন্য সুপারিশ তৈরি করা হয়।

ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্যরা হলেন—রাফেল কবির, আব্দুর রাজ্জাক রুপম, মো. মামুন অর রশিদ, মিজানুর রহমান, মো. আনোয়ার সাদাত, ইলিয়াস মোল্লাহ, আবু সালেহ মোহাম্মদ জুবায়ের আলম, মো. ফারাবী, মাহতাবুর রহমান, সানাউল করিম, সজিব বড়ুয়া ও মিরন খান।

তবে এনআইসিটিএফ বলছে, আইসিটি খাতের পূর্ণাঙ্গ সংস্কারে আরও কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইসিটি খাতের জন্য পৃথক ‘এসএলটি’ নির্দেশিকা তৈরি, ‘আইসিটি-এসটিডি’ বা মানসম্মত দরপত্র দলিল প্রণয়ন, স্বাধীন ‘আইসিটি স্পেসিফিকেশন রিভিউ কমিটি’ গঠন এবং জ্ঞান হস্তান্তর ও হ্যান্ডওভার সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করা।

সংগঠনটি জানিয়েছে, এসব বিষয় বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে তাদের সংলাপ ও নীতিনির্ধারণী গবেষণা অব্যাহত থাকবে।

এনআইসিটিএফ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি বিএনপির আইসিটি দপ্তরের সহযোগী ও সমমনা পেশাজীবীদের একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে আইসিটি খাতের পেশাজীবী, গবেষক, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিবিদরা যুক্ত রয়েছেন।

ম্যাংগোটিভি / আরএইচ

Share.
Exit mobile version