Friday, September 18

সরকারের আয়-ব্যয়ের ব্যবধান মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। রাজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণ কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। ফলে অর্থবছরের শুরু থেকেই বাজেট বাস্তবায়নে ঋণ করতে হচ্ছে সরকারকে। তবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সরকার বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজছে। সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে-এমন আশঙ্কা থেকেই এ উদ্যোগ। এর অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড এবং অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সুকুক বা ইসলামী বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি বহুপক্ষীয় সংস্থার কাছ থেকে বাজেট সহায়তা, স্বল্পমেয়াদি সার্বভৌম সুকুক, অভ্যন্তরীণ ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে বন্ধকি ঋণ এবং সবুজ ও নীল বন্ডসহ বিভিন্ন নতুন অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এগুলো অর্থ সংগ্রহের বিকল্প পদ্ধতি হলেও শেষ পর্যন্ত সবই ঋণ। তাই রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মূল লক্ষ্য থেকে সরকারের মনোযোগ সরে যাওয়া উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ টেকসইতার মূল্যায়নে বাংলাদেশের অবস্থান ‘নিম্ন ঝুঁকি’ থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’তে উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস ও এসঅ্যান্ডপি ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সরকার মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি উৎস থেকে এসেছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা। আর অভ্যন্তরীণ উৎস, অর্থাৎ ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে।

চার বাজারে বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ

সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাই ও কৌশল নির্ধারণে গত জুলাইয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণিকে প্রধান করে গঠিত কমিটিতে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

কমিটি তাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। ওই পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রথমবারের মতো চীন, জাপান, হংকং ও যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

এ ধরনের বন্ড ইস্যুর বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্মতি দিয়েছেন। বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে অর্থ বিভাগ। অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বন্ড ইস্যু কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত সূত্র জানিয়েছে, চীনের বাজারে ‘পান্ডা বন্ড’ ছাড়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক ব্যাংক বা বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ইস্যু করা বন্ডকে পান্ডা বন্ড বলা হয়। এর প্রধান বিনিয়োগকারী সাধারণত চীনের নাগরিকরা হলেও কিছু ক্ষেত্রে অন্য দেশের বিনিয়োগকারীরাও এতে অংশ নিতে পারেন।

জাপানের বাজারে ‘সামুরাই বন্ড’ ছাড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে বাংলাদেশের। জাপানি মুদ্রা ইয়েনে ইস্যু করা বৈদেশিক বন্ডকে সামুরাই বন্ড বলা হয়। এ ছাড়া হংকংয়ের বাজারে ‘ডিমসাম বন্ড’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডলারভিত্তিক বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনা রয়েছে।

চারটি বাজারে কোন ধরনের বন্ড কত পরিমাণে এবং কী শর্তে ছাড়া হবে, তা পরবর্তী পর্যায়ে চূড়ান্ত করা হবে।

আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাই ও কৌশল নির্ধারণে বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান ও এইচএসবিসির বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেবে সরকার।

গত ২০ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর প্রস্তুতি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। বৈঠকে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানান, অতীতে ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অর্থ বিভাগ সার্বভৌম বন্ড ইস্যুতে আগ্রহী ছিল না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অনুকূল সুদে বন্ড ইস্যুর জন্য আগে বাংলাদেশের ঋণমান উন্নত করা প্রয়োজন।

সেতু ও অবকাঠামোর বিপরীতে সুকুক

বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোর বিপরীতে সুকুক বা ইসলামী বন্ড ইস্যুর বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্মিত ও নির্মাণাধীন সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর বিপরীতে বড় অঙ্কের সুকুক ইস্যুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়।

সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি সুকুক ইস্যু করছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার সুকুক ইস্যু হয়েছে। এসব অর্থ বড় অবকাঠামো প্রকল্প, নিরাপদ পানি সরবরাহ, শিক্ষা ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে বেশির ভাগ সুকুক অ-বিক্রয়যোগ্য হওয়ায় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বিক্রি করা যায় না। সম্প্রতি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুকূলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিক্রয়যোগ্য সুকুক ইস্যু করা হয়েছে। এখন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিক্রয়যোগ্য সুকুক ইস্যুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাজেট সহায়তা ও তহবিল পুনর্বিন্যাস

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি ১৫০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ৭৮৫ মিলিয়ন ডলার বিদ্যমান ১২টি চলমান প্রকল্পের অব্যবহৃত বা ধীরগতির ঋণ থেকে সরিয়ে বাজেট সহায়তায় রূপান্তর করা হয়েছে।

এর বাইরে সার ও খাদ্য আমদানির জন্য ৩০ কোটি ডলার এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট নিরসন ও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষায় ৪০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে ১৪০ কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ১০০ কোটি ডলার সরাসরি নীতিভিত্তিক বাজেট সহায়তা হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ ছাড়া এডিবির সঙ্গে পাঁচ বছর মেয়াদি ৫ বিলিয়ন ডলারের ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ চালু করা হয়েছে, যা প্রতিবছর অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলার ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করছে।

এর পাশাপাশি অফশোর ব্যাংকিং কাঠামোর ব্যবহার, অভ্যন্তরীণ ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে বন্ধকি ঋণ সুবিধা এবং সবুজ ও নীল বন্ডের মতো বিভিন্ন নতুন ঋণ উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

সতর্কতার পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে ঝুঁকি ও খরচ দুটিই বেশি। এ বন্ডের ক্রেতা কারা হবে, কী সুদ দিতে হবে এবং কতটা ঝুঁকি প্রিমিয়াম দিতে হবে—এসব বিষয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা মাথায় রাখতে হবে। দেশটির সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ডের ভূমিকা ছিল। অনেক বন্ড ছিল স্বল্পমেয়াদি। একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বন্ডের অর্থ পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছিল। একই সময়ে পর্যটন আয় ও প্রবাসী আয় কমে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা দ্বিপক্ষীয় ঋণের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল হবে এবং খুব দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নও পাওয়া যাবে না। ফলে এটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আহরণের বিকল্প নয়। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ও অপচয়মূলক ব্যয় এবং বিলাসী উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রাজস্ব বাড়াতে হলে সরকারি ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বন্ডের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে এর কাঠামো এবং কার কাছে বন্ড বিক্রি করা হচ্ছে, তার ওপর। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলারভিত্তিক বন্ড ইস্যু করলে বিনিময় হার ও সুদ পরিশোধের ঝুঁকি থাকে।

তিনি ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার আর্থিক সংকটের উদাহরণ দিয়ে বলেন, বৈদেশিক মুদ্রায় উচ্চ সুদের বন্ড অনেক সময় অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সূত্র: সমকাল

ম্যাংগোটিভি / আরএইচ

Share.
Exit mobile version