কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। এআই ব্যবহার করে ডিপফেক তৈরি, মানুষকে হয়রানি, শিশুদের লক্ষ্য করে অপতৎপরতাসহ নানা ধরনের অপব্যবহারের ঘটনায় সামাজিক ও বিশেষজ্ঞ মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের দাবি, দেশে-বিদেশে স্বার্থান্বেষী মহল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত তৈরির লক্ষ্যে মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ, মতামত ও ছবি প্রচার করছে।
এআইয়ের অপব্যবহার পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌম নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।’
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, তারা ‘সাইবার স্কোয়াড’ নামে কয়েকটি গোষ্ঠীকে শনাক্ত করেছেন, যাদের সমালোচকেরা ‘বট বাহিনী’ বলে অভিহিত করেন। তাদের ভাষ্য, এসব গোষ্ঠী কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলটির পক্ষে অবস্থান নিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
নিরাপত্তা সংস্থায় কর্মরত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ব্যবহার করে তৈরি করা বিভ্রান্তিকর গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও শিল্পীদের মতো গণ্যমান্য ব্যক্তিদের চরিত্রহনন এবং সুনাম ক্ষুণ্ন করার হীন তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে।’
এআইয়ের ব্যবহার ও ঝুঁকি
এআই এমন এক ধরনের প্রযুক্তি, যা লেখা, ছবি ও ভিডিও তৈরি এবং তথ্য বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও কাজের গতি ত্বরান্বিত করতে নানা খাতে এর ব্যবহার বাড়ছে।
তবে এর অপব্যবহার নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠান নির্ভরযোগ্য, বোধগম্য ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য এআই ব্যবস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, দ্রুত বিকাশমান এআই মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের আশঙ্কা, এআই এমনকি সমগ্র মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করার কাজে ব্যবহার হতে পারে। গুগল ডিপমাইন্ডও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে ওপেনএআইয়ের প্রধান বিজ্ঞানী ইয়াকুব পাচোস্কি এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি ও প্রসার নিয়ে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এআইয়ের ভবিষ্যৎ যাতে মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তা নিশ্চিত করতে আরও হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।
এ ছাড়া এআই-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তত ১ হাজার ৩০০ জন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী সম্প্রতি এক খোলা চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির রাশ টানতে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এআই নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব
সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা বলেন, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কনটেন্টের কারণে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে তাঁরা তা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেন।
এআইয়ের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তারা প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর কঠোর প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশ বর্তমানে ডিজিটাল ও সাইবার ক্ষেত্রে ‘অপরাধের দ্রুত বিবর্তন’ প্রত্যক্ষ করছে। এ পরিস্থিতি সরকারকে পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং পুলিশের রেঞ্জ সদর দপ্তরগুলোতে আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট ও গবেষণাগার স্থাপনের পরিকল্পনা নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে ১৭ মার্চ ভিয়েনায় ‘গ্লোবাল ফ্রড সামিট’ অনুষ্ঠানে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্টের ব্যাপক বিস্তার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সন্ত্রাসবাদ, মাদক, মানবপাচার, দুর্নীতি ও আর্থিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করায় বাংলাদেশ এআইভিত্তিক অপরাধ শনাক্তকরণ ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতা জোরদার করছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অপতথ্য
সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য সহায়ক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মানহানিকর বক্তব্য, ভুল তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অনেক দেশে বর্তমানে ৪৪ শতাংশ অপরাধ সাইবার পরিসরে সংঘটিত হচ্ছে। বাংলাদেশও এ বিপদ থেকে নিরাপদ নয়। অনলাইন জালিয়াতি, যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে ব্ল্যাকমেইল, নারীদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং সামাজিক ও ধর্মীয় শৃঙ্খলা বিনষ্টের মতো কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সময়োপযোগী আইনের কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ কাদের গনি চৌধুরী সম্প্রতি এক মুক্ত আলোচনায় বলেন, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীলতা ছড়ানো এবং নারী, শিশু ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অনলাইনে হয়রানি কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
তিনি প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইন সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কোনো সরকারি সংস্থা নাগরিকদের সাইবার অধিকার লঙ্ঘন করলে তার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। সূত্র: বাসস
ম্যাংগোটিভি / আরএইচ
