বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের ধরণে নতুন এক ধারণা দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে- ইএসজি ইনভেস্টমেন্ট (ESG Investment), যার পূর্ণরূপ Environmental, Social and Governance। অর্থাৎ, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন শুধু মুনাফা নয়, বরং পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও কর্পোরেট সুশাসনও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
ইউরোপ ও আমেরিকায় এই ধরণের বিনিয়োগ ইতোমধ্যেই মূলধারায় পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বড় ফান্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো এখন বিনিয়োগের আগে প্রতিষ্ঠানটির ইএসজি-সূচক যাচাই করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে আইনগত কাঠামো গড়ে তুলেছে।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। ভারত শীর্ষ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য ইএসজি-রিপোর্ট প্রকাশ বাধ্যতামূলক করেছে। চীন ‘Green Finance’ নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে, যেখানে পরিবেশবান্ধব শিল্পে কর ছাড় ও কম সুদের ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামেও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পরিবেশ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে এখনো ইএসজি বিনিয়োগ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি, তবে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব কারখানা, সোলার এনার্জি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ছে। ইতিমধ্যে দেশের গার্মেন্টস খাত বিশ্বের সর্বাধিক এলইইডি সার্টিফায়েড গ্রিন ফ্যাক্টরি গড়ে তুলেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্পোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইন চালু করেছে, যা স্বচ্ছতা ও শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার নিশ্চিত করছে। তবে ইএসজি-ভিত্তিক বাধ্যতামূলক নীতিমালা এখনো গৃহীত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইএসজি বিনিয়োগের বড় চ্যালেঞ্জ হলো-কোম্পানিগুলোর তথ্য প্রকাশে অনীহা, বিনিয়োগকারীদের অজ্ঞতা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সংস্কৃতির অভাব। তবুও, বিদেশি ফান্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর আগ্রহের কারণে বাংলাদেশের জন্য এটি বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইএসজি রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক করা, পরিবেশবান্ধব শিল্পে কর ছাড়, বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তথ্যপ্রকাশ নিশ্চিত করা গেলে-বাংলাদেশ বৈশ্বিক বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
তাদের ভাষায়, ‘ইএসজি’ বিনিয়োগ শুধু পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা আনবে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলবে।’

