১০–৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বাতিলের দাবি জানিয়েছে দেশের তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার খাতের দুই শীর্ষ সংগঠন—বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পৃথক চিঠিতে এ দাবি জানানো হয়। বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান এবং বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম চিঠিগুলোতে স্বাক্ষর করেন।
এর আগে গত ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠি পাঠায়।
চিঠিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ উল্লেখ করে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত জাতীয় অর্থনীতি, রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে। দীর্ঘদিন ধরে ডব্লিউটিওর নিয়ম অনুযায়ী রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল হিসেবে সুতা বন্ড সুবিধায় আমদানি করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সংগঠন দুটি বলছে, ১০-৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা স্পিনিং খাতের বিদ্যমান সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান নয়। বরং এতে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে এবং উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
চিঠিতে আরও সতর্ক করা হয়, কাঁচামাল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াসহ অন্যান্য প্রতিযোগী দেশে নিয়ে যেতে পারে। এর ফলে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ জানায়, সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রভাব হিসেবে গ্রে ফ্যাব্রিক আমদানি বাড়বে। এতে দেশীয় নিটিং মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাবে এবং ছোট ও মাঝারি নিটিং কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এর ফলে কর্মসংস্থান ও দেশীয় ভ্যালু অ্যাডিশন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চিঠিতে বলা হয়, ভারত বর্তমানে ১০–৩০ কাউন্ট সুতা ও গ্রে ফ্যাব্রিক—উভয়েরই প্রধান সরবরাহকারী। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে ভারতীয় সরবরাহকারীদের মূল্য নির্ধারণ ক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে এবং বাংলাদেশ কার্যত একটি ‘ক্যাপটিভ বায়ার’-এ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংগঠন দুটি আরও উল্লেখ করে, দেশে উৎপাদিত সুতার প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে পোশাক খাত দুর্বল হলে স্পিনিং খাতও টেকসই থাকবে না।
এ ছাড়া টেকসই ও সার্টিফায়েড তুলা সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ জানায়, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ টেকসই ও সার্টিফায়েড তুলা ভারত থেকে আমদানি করা হয়। এ খাতে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে চাহিদা হ্রাস, মূল্যচাপ, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সংকট ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেছে সংগঠন দুটি। তাদের দাবি, গত ছয় মাসে তৈরি পোশাক খাতে ব্যবসা প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে এবং প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ বলছে, নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে স্পিনিং ও তৈরি পোশাক-উভয় খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, যৌক্তিক সুদের হার, ডব্লিউটিও-সম্মত নীতিগত সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক উদ্যোগই হতে পারে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
ম্যাংগোটিভি /আরএইচ

