বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম, অদক্ষতা ও খেলাপি ঋণের বোঝা বইতে থাকা নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবশেষে বন্ধের পথে। নতুন ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স–২০২৫-এর অধীনে প্রতিষ্ঠানগুলোকে লিকুইডেশনের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড। দেশের আর্থিক খাতে এই প্রথম এত বড় পরিসরে এনবিএফআই বন্ধ হতে যাচ্ছে একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায়।

রোববার (১ ডিসেম্বর) গভর্নর আহসান এইচ মানসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আনুষ্ঠানিকভাবে লিকুইডেটর নিয়োগ, সম্পদ বিক্রি ও বকেয়া পরিশোধসহ লিকুইডেশন প্রক্রিয়া চালাতে পারবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, দ্রুতই প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি আমানতকারীদের সুরক্ষার স্বার্থে। তবে বাজারে বড় প্রশ্ন-শেয়ারহোল্ডারদের কী হবে? কারণ নয়টির মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠানই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। এর আগে পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণের সময়ও শেয়ারহোল্ডাররা কোনো মূল্য পাননি।

বন্ধ হতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-ফাস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং, ফেয়ারস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, অভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।

এই নয়টি প্রতিষ্ঠানই এনবিএফআই খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫২ শতাংশ ধরে রেখেছিল। গত বছরের শেষে খাতে মোট খেলাপি দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা।

অবস্থা এতটাই খারাপ যে, আটটির মধ্যে সাতটির শেয়ারপ্রতি নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) ঋণাত্মক ৯৫ টাকায় নেমে গেছে। অর্থাৎ সম্পদ বিক্রি করলেও শেয়ারহোল্ডারদের হাতে পাওয়ার মতো কোনো অর্থ অবশিষ্ট নেই।

গ্রাহকদের আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তিগত আমানত ৩ হাজার ৫২৫ কোটি। সর্বোচ্চ আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে—১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা।

গভর্নর আহসান এইচ মানসুর বলেছেন, গ্রাহকের আমানতই তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। সরকার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার মৌখিক সম্মতি দিয়েছে, যা দিয়ে আটকে থাকা আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, নজরদারির ঘাটতির ফল
বিশেষজ্ঞরা বলছেন-দুর্বল নজরদারি, ভুয়া সম্পদ দেখানো, অভ্যন্তরীণ অনিয়ম এবং স্বজনপ্রীতির ঋণে ডুবে বহু বছর ধরেই এনবিএফআই খাত ভাঙনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০টি প্রতিষ্ঠানকে ‘রেড জোনে’ রেখেছিল। এবার নয়টি চূড়ান্তভাবে বন্ধ হচ্ছে, বাকিদের টিকে থাকতে দিতে হবে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা।

এর আগে সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। ব্যাংক ও এনবিএফআই—দুই খাতেই নজিরবিহীন কঠোর অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অমানতকারীরা তাঁদের টাকা ফেরত পাবেন বলে আশাবাদ থাকলেও-শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের ভাগ্যে কী লেখা আছে—এই প্রশ্নটির এখনো কোনো স্পষ্ট জবাব মেলেনি।

Share.
Exit mobile version