ইরানের রাজপথে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আপাতত স্তিমিত হয়ে পড়েছে। দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, গত ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায় তেহরানসহ প্রধান শহরগুলোতে বড় ধরনের সংঘাত বা গণজমায়েতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে এই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলে মানতে নারাজ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তাদের মতে, এটি মূলত কঠোর দমন-পীড়ন ও দেশটিকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ফল।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক ফোয়াদ ইজাদি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বড় আকারের সংঘর্ষ বা জনসমাগম দৃশ্যমান নয়। তবে একই সঙ্গে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশের ভেতরের প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে। মুদ্রার রেকর্ড দরপতনের প্রতিবাদে প্রথমে তেহরানের ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নামেন। পরে নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভির আহ্বানে গত বৃহস্পতিবার হাজার হাজার মানুষ অর্থনৈতিক দুর্দশা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নেন। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পরই দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় সরকার, যা এখনও বহাল রয়েছে।
অধ্যাপক ইজাদি জানান, ইন্টারনেট বন্ধের পেছনে নিরাপত্তা কারণ দেখাচ্ছে প্রশাসন। তার দাবি, গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সময় মোসাদ ইরানের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নাশকতামূলক কার্যক্রম চালিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ দাবি করেছে, গত দুই সপ্তাহের আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৫৭১ জন ছাড়িয়েছে। তবে ইরান সরকার এই পরিসংখ্যানকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও বিদেশি গুপ্তচররা পুলিশ ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে সাড়ে তিনশ’র বেশি মসজিদ এবং প্রায় দুইশ’ অ্যাম্বুলেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে ইরানের রাজপথগুলো সরকারপন্থি সমর্থকদের দখলে রয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের পর। ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের দেশপ্রেমিক আখ্যা দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক বাতিল করেছেন। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ইরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে। তিনি আরও সতর্ক করেন, মার্কিন হামলার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে ইরান এক অস্থির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী পরিস্থিতি তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষ্য বলছে, দেশজুড়ে চলছে ধরপাকড় ও বিচার প্রক্রিয়া। কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকদের মতে, যে অর্থনৈতিক সংকট থেকে এই আন্দোলনের জন্ম, তার কোনো দৃশ্যমান সমাধান না হওয়ায় আপাত শান্ত পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে-তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
