Monday, September 21

জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, ঠিক সেভাবেই তা বাস্তবায়নে দ্রুত এগোতে চায় সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে জাতীয় সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কমিটির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি বৈঠক করার চেষ্টা করা হবে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারক ও বিচারপতি, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, জুলাই যোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি, শহীদ পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব মতামত গ্রহণের পর জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ তৈরি করে জাতীয় সংসদে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। সনদের বাইরে জাতীয় জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিপূরক প্রস্তাব এলে সেগুলোও কমিটি বিবেচনায় নেবে।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে প্রতিবেদন তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। আলোচনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।

কমিটির লক্ষ্য হলো ডিসেম্বরের মধ্যে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষ করা।

এর আগে জুলাই জাতীয় সনদকে ভিত্তি ধরে পুরো সংবিধান পর্যালোচনা করে সংশোধনী সুপারিশ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দলকে মতবিনিময়ের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫টি দল সরাসরি প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। কয়েকটি দল থেকে দু’জনের বেশি প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া একটি দল লিখিত বক্তব্য দিয়েছে এবং আরেকটি দলের প্রতিনিধিরা শেষ মুহূর্তে অসুস্থতা ও পারিবারিক কারণে উপস্থিত হতে পারেননি। সব মিলিয়ে প্রায় ১৭টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ হয়েছে বলে তিনি জানান।

লিখিত বক্তব্য দেওয়া দল হিসেবে এবি পার্টির নাম এবং অসুস্থতার কারণে অংশ নিতে না পারা দলের ক্ষেত্রে জাতীয় গণফ্রন্টের প্রতিনিধির অনুপস্থিতির কথা জানান কমিটির সভাপতি।

তিনি বলেন, যারা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেনি, তারাও আলোচনায় অংশ নিতে চাইলে কমিটির দরজা খোলা থাকবে। নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কোনো প্রস্তাব লিখিতভাবে দিলে সেটিও বিবেচনা করা হবে।

বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রক্রিয়াটি কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য কমিটির নেই।

তিনি বলেন, যারা আজ আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, তারা নিজেদের বক্তব্য ও প্রস্তাব দিয়েছেন। যারা এখনো আসেননি, তাদেরও লিখিত প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ থাকবে। প্রয়োজন হলে কমিটি তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে আবারও আলোচনায় ডাকতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের শুরুতেই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়গুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পাশাপাশি বিভিন্ন আইন, অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়ও সনদে আলাদা করে উল্লেখ রয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। আর যেসব বিষয়ে কোনো দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, সেগুলোও সংশ্লিষ্ট ভিন্নমতসহ বিবেচনায় রাখা হবে।

জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা কিছু সাংবিধানিক প্রস্তাবও বিশেষ কমিটি বিবেচনা করবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান।

তিনি উদাহরণ হিসেবে অর্থবছর পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বর্তমান অর্থবছর ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে বর্ষাকাল পড়ে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশের ঋতুচক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থবছর পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ হচ্ছে বলেও তিনি জানান। এ ধরনের কোনো পরিবর্তন করতে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারায় সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে বলে উল্লেখ তিনি করেন।

সংবিধানের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছু ভিন্নমত রয়েছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, উচ্চকক্ষ ১০০ সদস্যের হবে-এ বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও সদস্য নির্বাচন বা প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ সংসদে পাওয়া আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলেছেন, আবার কেউ ভোটের আনুপাতিক হারের ভিত্তিতে গঠনের কথা বলেছেন।

এ ধরনের বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনী ইশতেহারে অবস্থান স্পষ্ট করে জনগণের ম্যান্ডেট পেলে পরবর্তী সময়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা

নেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে তিনি জানান।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপিকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চলছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধন সংসদে আনার লক্ষ্যে কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।

তিনি বলেন, বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন তৈরির পর সেটির ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে আসবে। এরপর সংসদে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তিতে বিলটি গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।

বর্তমান সরকার যেসব বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তন হলে নতুন সরকার সেসব অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করলে এবং সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে তারা সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারবে।

তিনি বলেন, সংবিধান একটি চলমান রাষ্ট্রীয় দলিল। সমাজের প্রয়োজন ও জনগণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধন হয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবকিছু স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া সম্ভব নয়।

সংবিধান সংশোধন সংসদের মাধ্যমে হলে ভবিষ্যতে আদালতে তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় গৃহীত সংবিধান সংশোধনী এবং নতুন সংবিধান প্রণয়নের বিষয় এক নয়।

তিনি বলেন, সংস্কার পরিষদ গঠন করলেই তার মাধ্যমে গৃহীত কোনো সংশোধনী আদালতের চ্যালেঞ্জের বাইরে থাকবে-এমন ধারণারও ভিত্তি নেই।

একটি সংবিধান সংশোধন হলে সেটি সংশোধন হিসেবেই গণ্য হবে; আর নতুন সংবিধান প্রণয়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান বিদ্যমান থাকায় নতুন করে সংবিধান প্রণয়নের প্রয়োজন নেই বলেও নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। এর আগেও সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেছিলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান পুনর্লিখনের প্রয়োজন নেই; সংশোধনের মাধ্যমেই তা করা সম্ভব।

বৈঠকে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সংস্কার কমিশনের পুরোনো প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় আনার বিষয়ও উঠে আসে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এর আগে ছয়টি সংস্কার কমিশন বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ দিয়েছে। সেসব সুপারিশের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে এবং পরবর্তীতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে।

তাই এখন আবার পুরোনো সংস্কার কমিশনের সব প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় আনলে প্রক্রিয়া আরও জটিল হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে কোনো রাজনৈতিক দলের নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব থাকলে তা লিখিতভাবে দিলে কমিটি নোট করে বিবেচনা করবে।

বৈঠকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক নাম নিয়েও একটি প্রস্তাব এসেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

‘পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’-এর বাংলা অনুবাদ নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ বা অনুরূপ নাম ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে বিষয়টি আগে আলোচিত এবং নিষ্পত্তিকৃত বিষয়গুলোর মধ্যে পড়ে বলে উল্লেখ করেন তিনি। নতুন করে প্রস্তাব আসায় সেটিও কমিটির নোটে রাখা হবে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, উচ্চকক্ষ ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থার রাজ্য প্রতিনিধিত্বকারী কক্ষের মতো হবে না। বরং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেওয়ার ধারণাও আলোচনায় এসেছে।

তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে বলে তার বক্তব্যে উঠে আসে।

বিশেষ কমিটির সুপারিশের পর সংসদে সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে। এরপর সংসদে বিস্তারিত আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে বিলটি বিবেচনা করা হবে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যতটা সম্ভব রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি করেই এগোতে চায় কমিটি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হলো সনদে যেভাবে ঐকমত্য হয়েছে, সেই কাঠামো অনুসরণ করা এবং প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধন সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করা।

উল্লেখ্য, ১৩ জুলাই ২০২৬ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়; বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব যুক্ত করে কমিটিকে ১৭ সদস্যে পুনর্গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছিল।

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, কমিটির সদস্য ও আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, কমিটির সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, কমিটির সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এবং কমিটির সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। সূত্র: বাসস

ম্যাংগোটিভি /আরএইচ

Share.
Exit mobile version