রাজধানীর গুলশানে সম্প্রতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
ভবিষ্যতে রাজধানীর কোথাও নিষিদ্ধ দলটির নেতা-কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে মিছিল বা কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সে বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
কোনো থানা এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ওসি ও উপ-পুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) দায় নিতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে তাদের কার্যদক্ষতাও মূল্যায়ন করবে ডিএমপি সদর দপ্তর।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা বা ক্রাইম কনফারেন্সে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় শুধু ঘটনা ঘটার পর অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে সম্ভাব্য মিছিল, জমায়েত ও অপতৎপরতা ঠেকাতে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও রাতের চেকপোস্টে নজরদারি বাড়ানো, ভাড়াটিয়াদের তথ্য যাচাই এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
ক্রাইম কনফারেন্সে উপস্থিত ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। ডিএমপির বিভিন্ন বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারসহ ৫০ থানার ওসিরা সভায় উপস্থিত ছিলেন। আগস্ট মাসে রাজধানীতে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের চিত্র পর্যালোচনার পাশাপাশি সামনের দিনগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের করণীয় নিয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ডিএমপির গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান বলেন, গুলশানের সাম্প্রতিক ঘটনার বিষয়টি সভায় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে ওই ঘটনায় কোনো নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে এককভাবে দায়ী করা হয়নি। কোথায় তথ্যের ঘাটতি ছিল, কেন আগাম প্রস্তুতি আরও কার্যকর করা যায়নি এবং ভবিষ্যতে কীভাবে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের আকস্মিক মিছিলের পর রাজধানীর বাইরে থেকে লোকজন এসে যাতে ঢাকায় কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সেজন্য ঢাকার প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও রাতের চেকপোস্টগুলোতে ব্লক চেকসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে বলা হয়েছে। সন্দেহজনক ব্যক্তিদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগেই তাদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভায় উঠে আসে, গত শুক্রবার গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মিছিলের বিষয়ে পুলিশ মাত্র আট মিনিট আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য পেয়েছিল। তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মিছিল ঠেকাতে গুলশান থানা পুলিশ তৎপর হয়। তবে এত অল্প সময়ে বড় ধরনের জমায়েত প্রতিরোধে পুলিশের প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
সভায় বলা হয়, কোনো নির্দিষ্ট থানা এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে শুধু গোয়েন্দা সংস্থার ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এবং জোনের ডিসিকেই মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অপারেশনাল ঘাটতি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
ক্রাইম ডিভিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, কমিশনার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ইউনিট বা কর্মকর্তা কাজ করতে না পারলে সেই জায়গায় পরিবর্তন আনা হবে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি বা অপেশাদার আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, ‘যে জায়গায় কাজ হবে না, সেই জায়গায় পরিবর্তন’।
গোয়েন্দা সমন্বয়ে গুরুত্ব
গুলশানের ঘটনা নিয়ে আলোচনায় গোয়েন্দা সমন্বয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সভায় বলা হয়েছে, শুধু পুলিশের নিজস্ব তথ্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ডিজিএফআই, এনএসআই, সিটিএসবি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান করতে হবে।
কোনো সম্ভাব্য মিছিল, জমায়েত বা নাশকতার তথ্য পাওয়া গেলে তা দ্রুত মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে জানিয়ে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল ঠেকানোর নামে নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। সভায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, শুধু অতীতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল বা কোনো দলের সমর্থক ছিলেন—এমন পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না।
মিছিলে সরাসরি অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ছবি, ভিডিও ও তথ্যপ্রযুক্তিগত বিশ্লেষণসহ সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
একটি থানার ওসি বলেন, মিছিলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কাউকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করে হয়রানি করা যাবে না। একই সঙ্গে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে কোনো পুলিশ সদস্য আর্থিক সুবিধা নিলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
আগাম প্রতিরোধে জোর
একাধিক কর্মকর্তা জানান, কমিশনারের নির্দেশনার একটি বড় অংশ ছিল অপরাধ সংঘটনের আগেই তা ঠেকানোর কৌশল নিয়ে। অর্থাৎ কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আসামি ধরার পরিবর্তে আগাম তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং সম্ভাব্য অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও অন্যান্য হোটেলে অবস্থানকারী অতিথিদের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার।
তেজগাঁও বিভাগের একজন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, বাসাবাড়িতে নতুন ভাড়াটিয়া ওঠার তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি পুরোনো ভাড়াটিয়াদের তথ্যও হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে সন্দেহজনক সাবলেট, অস্থায়ী আবাস ও নতুন করে ঢাকায় আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সভায় কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওসিদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্য এবং স্থানীয় নাগরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। কোনো এলাকায় নতুন বা অপরিচিত ব্যক্তির আনাগোনা কিংবা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড চোখে পড়লে স্থানীয়রা যাতে দ্রুত থানায় তথ্য দিতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে বলা হয়েছে।
থানায় ওসিদের উপস্থিতি নিশ্চিতের নির্দেশ
থানায় ওসিদের উপস্থিতি নিয়েও সভায় কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। সম্প্রতি তেজগাঁও থানায় পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওসিকে না পাওয়ার ঘটনা এবং পল্টন থানায় গিয়ে আইজিপি আলী হোসেন ফকির ও ডিএমপি কমিশনারও ওসিকে না পাওয়ার বিষয়টি সভায় আলোচনায় আসে।
পরে তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈন্যু মারমা এবং পল্টন মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খানকে প্রত্যাহার করা হয়।
যুগ্ম কমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, এসব ঘটনার পর থানায় ওসিদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে আরও কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিউটির সময়ে ওসিদের থানায় অবস্থান করে গুরুত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্ধারিত পোশাক পরতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে থানার বাইরে যেতে হলে জিডিতে বিষয়টি উল্লেখ করে দায়িত্ব পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে বুঝিয়ে দিতে হবে।
একই সঙ্গে থানার পরিবেশ ও পুলিশ সদস্যদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো থানায় দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, বিশৃঙ্খলা বা অপেশাদার আচরণ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধেও অভিযান
সভায় ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়। এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে পুলিশ সদস্যদের ডিউটি করতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো এলাকায় নিরাপত্তার শূন্যতা তৈরি না হয়।
অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
গুলশানের ঘটনায় ইতোমধ্যে ডিবি ও থানা পুলিশের সমন্বিত অভিযানে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তারদের মধ্যে ঢাকার বাইরে থেকে আসা ব্যক্তিও রয়েছেন।
বগুড়া, গোপালগঞ্জ, আলফাডাঙ্গা ও হরিরামপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ব্যক্তিদের কয়েকজন ঢাকায় বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন। একটি চীনা রেস্টুরেন্টের পাঁচজন ওয়েটারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও সভায় তথ্য দেওয়া হয়।
এ ছাড়া নিরাপত্তাকর্মী ও অটোরিকশাচালকের মতো পেশার আড়ালে অবস্থান করা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
ম্যাংগোটিভি /আরএইচ

