সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রেখে সংশোধন করা হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা আইন। এ লক্ষ্যে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া করেছে সরকার। বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইনে গুজব ও অপতথ্য প্রচারের জন্য এ ধরনের কোনো ধারা বা শাস্তির বিধান নেই।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বিভিন্ন সাইবার অপরাধের শাস্তি বাড়ানোর পাশাপাশি মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা ও বুলিংয়ের উদ্দেশ্যে ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত তৈরি, সংরক্ষণ, প্রেরণ, প্রকাশ, প্রচার বা প্রকাশের হুমকিকেও অপরাধের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত তথ্য-উপাত্তের বিষয়টিও যুক্ত করা হচ্ছে।
খসড়া আইনে কোম্পানির নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত, বাতিল বা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। গুরুতর অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে এবং অন্যান্য অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করার বিধানও রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া অপতথ্য, গুজব, মানহানিকর ও অবমাননাকর কনটেন্ট ব্লকের ক্ষমতার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্লক করা কনটেন্টের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নিচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হওয়া ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ সংশোধনে গত ২৯ জুন একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীকে প্রধান করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে রাখা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশিদ ভুঞা বলেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে এটি প্রাথমিক বৈঠক। বিভিন্ন শ্রেণির অংশীজনের সঙ্গে আরও বৈঠক করা হবে। সব পক্ষের মতামত নিয়ে আইনটি সংশোধনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সাইবার স্পেস ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যারা সাইবার স্পেস ব্যবহার করে মানুষের চরিত্রহনন ও সাইবার বুলিংয়ের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
গুজব ও অপতথ্যে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড
প্রস্তাবিত আইনে কোনো ব্যক্তি সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়ায় ‘গুজব’ বলতে এমন অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে বোঝানো হয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করার সম্ভাবনা রাখে।
অন্যদিকে ‘অপতথ্য’ বলতে এমন মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বোঝানো হয়েছে, যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি, প্রকাশ বা প্রচার করা হয়।
মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন ও বুলিংও অপরাধ
সংশোধিত আইনে বর্তমান আইনের তুলনায় অপরাধের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি শাস্তি দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা এবং বুলিংয়ের উদ্দেশ্যে তথ্য-উপাত্ত তৈরি, সংরক্ষণ, প্রেরণ, প্রকাশ, প্রচার বা প্রকাশের হুমকিকেও অপরাধের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে অডিওকে আলাদাভাবে তথ্য-উপাত্তের আওতায় যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত তথ্য-উপাত্তের বিষয়টিও রাখা হয়েছে।
বর্তমান আইনে সাধারণ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে তা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে একই অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধের ক্ষমতা পাবে আদালত
প্রস্তাবিত আইনে কোনো কোম্পানি সাইবার আইনের অধীন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত ওই কোম্পানির নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত, বাতিল বা নিষিদ্ধ করার আদেশ দিতে পারবে।
এ ছাড়া কোম্পানির সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় কোম্পানি ছাড়াও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অংশীদারি কারবার, সমিতি, সংঘ, সংগঠন, ট্রাস্ট, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা অন্য কোনো আইনগত ব্যক্তিসত্তাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
গুরুতর অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সাইবার আইনের সব অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে না করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গুরুতর কয়েকটি অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে এবং অন্যান্য অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করার বিধান রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার অবকাঠামোয় হামলা বা ক্ষতিসাধন, সাইবার সন্ত্রাস, হ্যাকিং, গুরুতর সাইবার অপরাধ, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন, সেক্সটর্শন এবং সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রচারের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে করার প্রস্তাব রয়েছে।
অন্য অপরাধগুলোর বিচার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করার কথা বলা হয়েছে। এসব অপরাধ ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯’-এর তফসিলভুক্ত হলে মোবাইল কোর্টেও বিচার করা যাবে।
সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কনটেন্ট অবমুক্তির আবেদন করতে পারবেন
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তথ্য-উপাত্ত অপসারণ, স্থানান্তর বা ব্লকের ক্ষেত্রে তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর পরিবর্তে, এতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি এজেন্সি বা আদালতে তথ্য-উপাত্ত অবমুক্তির আবেদন করতে পারবেন। সরকার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে এজেন্সি বা আদালত আবেদনটি নিষ্পত্তি করতে পারবে।
যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার পাশাপাশি আইনগত প্রতিনিধি, অভিভাবক, পরিবারের সদস্য বা বৈধ স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অপতথ্য ও মানহানিকর কনটেন্ট ব্লকের ক্ষমতা বাড়ছে
খসড়া আইনে তথ্য অপসারণ বা ব্লকের ক্ষমতার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান আইনে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারলেও প্রস্তাবিত আইনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থা বা বাহিনীকে এই ক্ষমতার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া অপতথ্য বা গুজব, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানহানিকর কিংবা রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর তথ্যও অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করার আশঙ্কা থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
গণমাধ্যমের মতামত
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সংশোধিত আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টরা নতুন আইনের মাধ্যমে যাতে গণমাধ্যম বা সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধের সুযোগ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে জোর দেন।
খসড়া আইনে থাকা ‘মানহানি’ ও ‘হেয়প্রতিপন্ন’ শব্দের মাধ্যমে আইনটি অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও মত দেন তারা। একই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার বিধান খসড়া থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
সভা শেষে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান সাংবাদিকদের বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে এমন কোনো শব্দ বা বিধান রাখা হবে না, যার অপব্যবহার করে গণমাধ্যম বা অন্য কারও কণ্ঠ দমন করা যায়।
আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে আবারও সভা হবে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
ম্যাংগোটিভি / আরএইচ



