Friday, August 14

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস ছড়িয়ে অন্তত ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রথমে চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও পরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে দাঁড়ায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ি, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টরা হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নিহতদের মধ্যে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর মোহাম্মদ মনসুর আলী, মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন, হাবিবুর রহমান, পলাশ দাশ ও সানি দাশ রয়েছেন। এছাড়া পাবনার সুজানগরের আব্দুল আলীম সুজন এবং গাইবান্ধার রানা মিয়া ও খোকন মিয়া নিহত হয়েছেন। শরীফ নামের আরেক শ্রমিক চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান।

ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল। তবে স্ক্র্যাপ জাহাজের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা জাহাজের বিভিন্ন বিষয় দেখাশোনা করছিলেন। সকাল ৯টার দিকে একটি জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজ হয়। পরে সেখানে জমে থাকা গ্যাসে কয়েকজন হতাহত হন।

কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ আল মামুন জানান, শিপইয়ার্ডে মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ প্রথমে তাকে আটজনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। ঘটনাস্থলে তদন্ত না করা পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)। ক্যাপ্টেন মো. এনামকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

বিএসবিআরএর সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন জানান, দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে।

ইয়ার্ডের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। নিহতদের পরিবারকে সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি তাদের পক্ষ থেকেও আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হবে।

আট বছরে ১৪৬ শ্রমিকের মৃত্যু

জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসা। সংস্থাটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীন বলেন, গত দুই বছরে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় ১১ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আর গত আট বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪৬ শ্রমিক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাহাজ কাটার আগে ট্যাংকসহ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে গ্যাস ও অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থের উপস্থিতি পরীক্ষা করে নিরাপদ ঘোষণা করা জরুরি। বিশেষজ্ঞের পরীক্ষায় ট্যাংকে দাহ্য গ্যাস নেই—এমন নিশ্চয়তার পরই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কাটিং করার নিয়ম রয়েছে।

দুর্ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরও কীভাবে এলএনজি জাহাজের ট্যাংকে গ্যাস জমে ছিল। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা ইয়ার্ডে গিয়ে ভাঙচুর ও বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে। বিকেল ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।

নিহতদের মধ্যে একই এলাকার চারজন থাকায় ভাটিয়ারীতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মনসুর আলী ও নাছির উদ্দীন আপন ভাই। একই এলাকার পলাশ দাশ ও সানি দাশের মৃত্যুতেও তাদের পরিবারে নেমে এসেছে শোক ও অনিশ্চয়তা।

ম্যাংগোটিভি / আরএইচ

Share.
Exit mobile version