ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া তরুণ এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও ও সোলতানির পরিবার।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানি পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। রাজধানী তেহরানের উপকণ্ঠের কারাজ এলাকায় বসবাস করতেন তিনি। সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গত ৮ জানুয়ারি নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের মাত্র তিন দিনের মধ্যেই তাকে ফাঁসির সাজা দেয় ইরানের একটি আদালত।

সোলতানির পরিবারের অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও গোপনীয়। আদালতে পরিবারের কোনো সদস্য বা আইনজীবীকে উপস্থিত থাকার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এমনকি তার বোন—যিনি একজন নিবন্ধিত আইনজীবী—তাকেও আদালতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।

সোলতানির আত্মীয় সোমায়েহ সিএনএনকে বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। তবে এখনো সাজা পুরোপুরি বাতিল হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নই।”

পরবর্তীতে মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও এক বিবৃতিতে জানায়, এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার হোয়াইট হাউসে এক মতবিনিময় সভায় বলেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়েছে বলে তারা নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানতে পেরেছেন।

এর আগের দিন ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, বিক্ষোভ দমনে নির্বিচারে গুলি চালানো হচ্ছে এবং এসব হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হলে ইরানের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক করবে না।

উল্লেখ্য, দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইরানে ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে। আন্দোলনের মূল কারণ দেশটির ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। দীর্ঘদিনের অবমূল্যায়নের ফলে ইরানি রিয়েল বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রাগুলোর একটি। বর্তমানে এক ডলারের বিপরীতে প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার ইরানি রিয়েল লেনদেন হচ্ছে।

এর ফলে দেশজুড়ে চরম মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের ৩১টি প্রদেশে। আন্দোলনকারীরা সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া, জাতীয় পতাকা ছেঁড়া এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগ ও মৃত্যুর দাবিও তোলে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইরান সরকার আন্দোলনকারীদের ‘আল্লাহর শত্রু’ ঘোষণা করে এবং আন্দোলনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদের অভিযোগ তোলে। বিক্ষোভ দমনে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধের পাশাপাশি দেশজুড়ে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, চলমান সংঘর্ষে ইতোমধ্যে ১২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে এসব তথ্য সরকারিভাবে স্বীকার করেনি তেহরান।

Share.
Exit mobile version