জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যা, শেখ হাসিনার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে দমন-নীপড়নে সহায়তা করা ও উসকানি দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) বেলা দেড়টার পর রায় ঘোষণা করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যর বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্যরা হলেন, বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এ মামলায় হাসানুল হক ইনু একমাত্র আসামি।
মামলার জবানবন্দিতে ১০ জন সাক্ষী ইনুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, উসকানি ও হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন।
হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ায় মিছিলে অংশ নিয়ে গুলিতে আহত হওয়া রাইসুল হক তার জবানবন্দিতে বলেন, আমার নাম রাইসুল হক। আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ২৬ বৎসর। আমার বাড়ি মেহেরপুরে। আমি ঘটনার সময় কুষ্টিয়ায় কাস্টমস মোড় সংলগ্ন এলাকায় একটি মেসে ছিলাম। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ১৪ তারিখ যখন শেখ হাসিনা কোটা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’, ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে গালি দেয়, ঐদিন রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে আমরা কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের আশপাশে মিছিল করি। ১৬ জুলাই আবু সাঈদ শহীদ হন। ঐদিন আমরা কুষ্টিয়ায় শাপলা চত্বর থেকে মজমপুরের দিকে কয়েক হাজার ছাত্রজনতা মিলে মিছিল বের করি। মিছিলের সময় আমরা পুলিশ এবং আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের বাধার সম্মুখীন হই। এতদসত্ত্বেও আমরা মিছিল সম্পন্ন করি। পরবর্তীতে ১৮ জুলাই ২০২৪ সালে ডিসি কোর্টের সামনের মোড়ে আমরা যখন ৩০০ থেকে ৪০০ জন একত্রিত হই তখন পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের হামলার শিকার হই। তারপর আমরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাই। পরবর্তীতে যখন আমরা একত্রিত হয়ে আন্দোলন শুরু করি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের ওপর টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। তখন আমার কপালের ঠিক মাঝখানে শটগানের গুলি লাগে। (সাক্ষী এ পর্যায়ে তার কপালের মাঝখানের শটগানের গুলি লাগার চিহ্ন প্রদর্শন করেন)। যখন আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় তখন আমার মুখ থেকে একটি কথাই বের হচ্ছিল, ‘ভাই, আমার লাশ যেন বিজয় মিছিলে যায়, লাশ যেন দাফন না করা হয়।’
বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই কথাটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এমনটি অনলাইন নিউজেও প্রচারিত হয়। ১৮ তারিখের পর আমরা আর একত্রিত হতে পারি নাই। আমি নিজে জীবন রক্ষার জন্য চার মাস যাবৎ মেহেরপুর জেলার গাংনী থানাধীন আমার নিজ বাসস্থানে আত্মগোপনে ছিলাম। ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহত হওয়ার আশঙ্কায় ও ভয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানায় আমি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জিডি করি। আমি আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার পক্ষে ফেসবুক আইডি হতে আন্দোলনরত ছাত্রদের সমর্থনে ও সরকারের বিপক্ষে বিভিন্ন প্রকার পোস্ট ও কমেন্ট করি। কুষ্টিয়া মডেল থানা এলাকাধীন গোয়ালবাড়ি ট্রাফিক অফিসের পেছনে আমার বাসার সাথে থাকা ফার্নিচারের দোকান আছে। দোকান মালিক আমাকে অনেক দিন যাবত চেনেন ও জানেন এবং আমি তাকে একজন সম্মানিত ব্যবসায়ী হিসেবে জানি। উক্ত ঘটনা সম্পর্কে তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এই আমার জবানবন্দি।
মামলার এজাহার সুত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহতের ঘটনা এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে কলরেকর্ডের কথোপকথনের অডিওতে আন্দোলনকারীদের দমন-নীপড়ন ও হত্যায় উসকানি দিয়ে ষড়যন্ত্র ও সহায়তার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ মামলার তদন্ত শুরু হয়। ওই বছর ১১ সেপ্টেম্বর মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরে গত বছরের ২ নভেম্বর এ মামলায় অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ইনুর বিরুদ্ধে আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, নিজের নির্বাচনি এলাকা কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় উসকানি দেওয়া, শেখ হাসিনার সঙ্গে থেকে আন্দোলনকারীদের দমনে গুলির নির্দেশ দেওয়া, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের গুলির নির্দেশ দেওয়া ইত্যাদি। এ মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষে ১০ জন এবং আসামিপক্ষে দুইজন সাফাই সাক্ষ্য দেন। চলতি বছর ১৩ এপ্রিল যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়ে ১৩ মে শেষ হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য মতে, মামলাটির তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ৩ মার্চ। পরে তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চার্জ গঠন করা হয়। চলতি বছরের ১৩ মে যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়।
এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার তরফদার, প্রসিকিউটর মীজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর ফারুক আহমেদ, প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার পালোয়ান প্রমুখ। অপরদিকে হাসানুল হক ইনুর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী ও নাজনীন আহসান।
কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত
প্রসিকিউশন জানায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়া শহরে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। আহত হন বহু নিরীহ মানুষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইনুর বিরুদ্ধে উসকানি, প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রসহ সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এতে তার বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়।
৩৯ পৃষ্ঠার এই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)। এতে ২০ জনকে সাক্ষী রাখা হয়। তবে ১০ জন সাক্ষ্য দিয়ে এ মামলার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
ম্যাংগোটিভি /আরএইচ


