নন-লাইফ বিমা খাতে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য মিলেছে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) প্রতিবেদনে। এতে দেখা গেছে, বিভিন্ন কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের ‘ডামি এজেন্ট’ বানিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন।
প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে আইডিআরএ’র বিশেষ অডিটেও একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ে।
বিশেষভাবে প্যারামাউন্ট ইনস্যুরেন্সের অনিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে। কোম্পানিটি নয়জন নারীকে এজেন্ট দেখালেও তাঁরা ছিলেন নিস্ক্রিয় বা ডামি এজেন্ট। কোম্পানির দুই কর্মকর্তা তাঁদের সঙ্গে মিলে প্রায় ৬৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তদন্তে জানা গেছে, ওই নারীদের স্বামীরা আবার কোম্পানির বিভিন্ন শাখায় কর্মরত ছিলেন।
নিয়ম ভঙ্গ ও বেআইনি কমিশন
বিমা এজেন্ট নিয়োগবিধি ২০২১ অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা একসঙ্গে বেতন ও কমিশন নিতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবে অনেক অ-জীবন বিমা কোম্পানি এজেন্টদের নামে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেআইনি কমিশন দেয়। কাগজে-কলমে দেখানো হয় সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ। বাকি টাকা চলে যায় ডামি অ্যাকাউন্টে। এতে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লাভবান হচ্ছেন।
প্যারামাউন্ট ইনস্যুরেন্সের দাবি
অভিযোগ প্রসঙ্গে প্যারামাউন্ট ইনস্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাদ ইয়াহিয়া বলেন, অভিযুক্ত এজেন্টদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে কোম্পানিতে কোনো ডামি এজেন্ট নেই এবং আইডিআরএর সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর মতে, বিদ্যমান আইনে কর্মীদের আত্মীয়রা এজেন্ট হতে পারবে না—এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, আর এই ফাঁকফোকরই কাজে লাগানো হয়েছে।
আইডিআরএ জানিয়েছে, প্যারামাউন্টের অধিকাংশ অনিয়ম ঘটেছে ২০২১ সালের নতুন বিধি কার্যকর হওয়ার আগে। শুনানিতে কোম্পানিটিকে সতর্ক করা হয়েছে এবং নিয়ম মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
খাতজুড়ে অনিয়ম
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু প্যারামাউন্ট নয়, প্রায় সব নন-লাইফ বিমা কোম্পানিতেই একই ধরনের অনিয়ম চলছে। স্ত্রী বা স্বজনদের নামে কমিশনের টাকা তোলা হলেও তা কর রিটার্নে দেখানো হয় না। এতে কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং এবং দক্ষ এজেন্ট তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এনএসআই সুপারিশ
এনএসআই সুপারিশ করেছে, সব বিমা কোম্পানিতে ডামি এজেন্ট নিয়োগ বন্ধ করতে হবে, বেআইনি কমিশন দেওয়া যাবে না এবং নতুন করে সব এজেন্ট নিয়োগ খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ডামি এজেন্টদের নামে উত্তোলিত অর্থ করপত্রে দেখানো হয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে বলা হয়েছে।
বিমা খাতের অবস্থা
বাংলাদেশে বর্তমানে ৮২টি বিমা কোম্পানি রয়েছে, এর মধ্যে ৪৬টি নন-লাইফ বিমা ব্যবসা করে। ৪৩টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত শেয়ারবাজারে। দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ব্যবসায়িক ক্ষতির সময়ে এই খাত আর্থিক সুরক্ষা দিলেও অনিয়মের কারণে আস্থার সংকটে পড়ছে পুরো খাত।
ম্যাংগোটিভি/আরএইচ

