ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় দুই দিনের ব্যবধানে চারটি ভূমিকম্প জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুক্রবার ও শনিবার ঘটে যাওয়া এসব কম্পনের তিনটির উৎপত্তি নরসিংদী ও একটি ঢাকায় ছিল-যা রাজধানীর ভূমিকম্পঝুঁকি আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকালে নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় ৫.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পটি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তির কারণে তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলা। এতে শিশুসহ ১০ জন নিহত এবং ৬০০-র বেশি মানুষ আহত হন।
এর ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে শনিবার (২২ নভেম্বর) সকালে ৩.৩ মাত্রার এবং সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ৪.৩ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়-দুটোরই উৎস নরসিংদী। সন্ধ্যায় রাজধানীর বাড্ডায় ৩.৭ মাত্রার ভূমিকম্পও আতঙ্ক ছড়ায় নাগরিকদের মধ্যে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের নথিভুক্ত ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ৩৯টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে। এর মধ্যে ১১টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার এলাকার ভেতরে। অর্থাৎ ২৮ শতাংশের বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছে। এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ৩ দশমিক ৩ থেকে ৫ দশমিক ৭। এর মধ্যে শুক্রবার নরসিংদীতে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার (৫ দশমিক ৬) ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ঢাকার ১০০ থেকে ২৬৭ কিলোমিটারের মধ্যে বাকি ২৮টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল।
পাঁচ বছরে ১৮ জেলায় ভূমিকম্প হয়েছে। জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, হবিগঞ্জ, রাঙামাটি, চুয়াডাঙ্গা, শরীয়তপুর, যশোর ও কুড়িগ্রাম।
বাংলাদেশ ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান করায় বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবসময়ই বেশি। সাম্প্রতিক ভূকম্পনগুলো বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সামনে এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন-‘শক্তি আটকে ছিল, এখন তার উন্মোচন শুরু হয়েছে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে আরও ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার এত কাছে দীর্ঘ সময় বড় ভূমিকম্প হয়নি। কয়েক প্রজন্ম এমন ঝাঁকুনি দেখেনি। ঝুঁকি বাড়ছে।’
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী ভবন কাঠামো পরীক্ষা করার ওপর জোর দিয়ে বলেন-‘ঢাকার ভবনগুলো এখনই পরীক্ষা করা দরকার। ভবন সনদ প্রদান করলে মানুষ জানবে কোন ভবন বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি, কোনটি নয়। এতে সরকারের অর্থ ব্যয় হবে না।’
ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে—এর মধ্যে ১৫ লাখ একতলা–দোতলা, চার থেকে ছয়তলা ভবন প্রায় ৬ লাখ, আর বহু ১০–২০ তলা ভবনও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে-ঢাকার ১০০ কিলোমিটার এলাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে দুই থেকে তিন লাখ মানুষ হতাহত হতে পারে এবং অন্তত ৩৫ শতাংশ ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি আছে। এ কারণে ভূমিকম্পপ্রবণ শহরগুলোর তালিকায় ঢাকা এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নগর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ম্যাংগোটিভি/আরএইচ
