বহুল আলোচিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবারও ফিরে এসেছে। তবে এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে-এমনই রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ।

বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) সকালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চ কিছু পর্যবেক্ষণসহ সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের পূর্বের রায় এবং সংবিধানের সংশ্লিষ্ট সংশোধনী বাতিল করেন।

বেঞ্চের অন্যান্য বিচারকরা ছিলেন-বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এসএম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।

এ নির্বাচনে কেয়ারটেকার নয়
শুনানিতে আবেদনকারী পক্ষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আইনজীবীরা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে (ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন) তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সাংবিধানিক সুযোগ নেই। কারণ সংবিধানে বর্ণিত-সংসদ ভাঙার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের যে বিধান রয়েছে, তা এখন প্রযোজ্য নয়। সংসদ ভেঙেছে এক বছরেরও বেশি সময় আগে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভুইয়া বলেন, বর্তমান নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা কার্যকর নয়। পরবর্তী নির্বাচন থেকে এটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। একই মত প্রকাশ করেন বিএনপির আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির।

শিশির মনির বলেন, দেশ এখন একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে চলছে। তাদের বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন-এই তিন ম্যান্ডেট রয়েছে। সেই প্রক্রিয়াতেই আসন্ন নির্বাচন হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পক্ষ মোট চারটি রিভিউ আবেদন করে—সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন। এই চার আবেদনের একসঙ্গে শুনানি শেষে নতুন করে আপিল শুনানির সিদ্ধান্ত দেয় আপিল বিভাগ। গত ২১ অক্টোবর আপিল শুনানি শুরু হয়।

১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে তখনকার বিএনপি সরকার। এ সংশোধনীর বৈধতা প্রশ্নে ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন এম সলিম উল্লাহসহ তিন আইনজীবী। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুল দেন হাইকোর্ট। ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা রায় দেয় হাইকোর্ট। পরে হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল বিভাগে আপিল করে রিটকারীপক্ষ।

২০১০ সালের ১ মার্চ আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে আটজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শুনানিতে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির পক্ষে মত দেন। শুনানি শেষে ওই বছরের ১০ মে আপিল মঞ্জুর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় আপিল বিভাগ। তবে রায়ের দিন আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে অভিমত দিয়েছিলেন বিচারপতি খায়রুল হক। যদিও পূর্ণাঙ্গ রায়ে সেই পর্যবেক্ষণ ছিল না। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ২০১১ সালের ৩০ জুন আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তিসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রস্তাব পাস করিয়ে নেয়। একই বছরের ৩ জুলাই রাষ্ট্রপতি তাতে অনুমোদন দেন।

গত ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানবিরোধী ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন। ফলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরার পথ তৈরি হয়।

ম্যাংগোটিভি/আরএইচ

Share.
Exit mobile version